মাদকের অভয়ারণ্য: মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প
বিশেষ প্রতিবেদন_crimewatch24.com এর অনুসন্ধান_
ক্যাম্পে মাদকের সাম্রাজ্য
ঢাকার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প পরিণত হয়েছে মাদকের অভয়ারণ্যে। সাড়ে ১৭ একর আয়তনের এই বিহারিপল্লির ৩০টি পয়েন্টে প্রতিদিন খোলাখুলিভাবে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ও ফেনসিডিল। বছরে এই অবৈধ ব্যবসার লেনদেন দাঁড়ায় দেড়শ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে অন্তত এক ডজন ‘মাদক গডফাদার’ এবং তাদের নেতৃত্বে ৫ শতাধিক খুচরা বিক্রেতা এই ব্যবসায় সক্রিয়।
গত এক বছরে মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন অন্তত আটজন, আহত অসংখ্য। বছরের পর বছর এই ব্যবসা চললেও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও গডফাদাররা
একসময় ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন ইশতিয়াক ও নাদিম ওরফে পঁচিশ। নাদিম ২০১৮ সালে র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত এবং ইশতিয়াক করোনাকালে ভারতে মারা গেলে ক্যাম্পে নতুন গডফাদারদের উত্থান ঘটে।
বর্তমানে সক্রিয়দের মধ্যে আছেন বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, উলটা সালাম, হেরোইন সীমা, ইমতিয়াজসহ আরও অনেকে। বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার করছে।
তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ছিনতাই চক্র। এভাবে প্রায় দেড় হাজার অপরাধী ক্যাম্পে সক্রিয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
কিশোর-যুবকদের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া
আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ক্যাম্পের তরুণ-তরুণীদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মাদক ব্যবসা ও দেহ ব্যবসার মতো অনৈতিক কাজে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৪ লাখ টাকার মাদক বিক্রি হয়।
খুপরি ঘরে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মিনি বার’, যেখানে মাদক সেবনের পাশাপাশি তরুণীদের বাধ্য করা হয় যৌন ব্যবসায়।
পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ—অভিযান চালালেও গডফাদাররা থেকে যায় অধরা। আবার গ্রেফতার হলেও দুর্বল এজাহার ও সাক্ষীর অভাবে তারা সহজেই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, তারা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে অভিযান চালাচ্ছে। তবে বাসিন্দারা অভিযোগ করছেন, পুলিশ চাইলে একদিনেই মাদক ব্যবসা বন্ধ করতে পারে, কিন্তু অনৈতিক সুবিধার কারণে তা করছে না।
মামলা ও গ্রেফতার
গত এক বছরে ক্যাম্পে চার শতাধিক মামলা হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছে দুই হাজারের মতো মানুষ। তবুও গডফাদাররা অক্ষত রয়েছেন।
বুনিয়া সোহেল: মাদক ও হত্যা মামলাসহ ৪০টিরও বেশি মামলা। র্যাব গ্রেফতার করলেও জামিনে মুক্ত।
পিচ্চি রাজা: ডজনখানেক মামলা। গ্রেফতার হলেও জামিনে মুক্ত হয়ে সক্রিয়।
চুয়া সেলিম: হত্যা ও মাদক মামলাসহ ৩৭টির বেশি মামলা, তবুও জামিনে মুক্ত হয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ মতামত
ক্রিমিনাল আইন বিশেষজ্ঞ ন্যাশনাল লইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও মাদক বিরোধী জোটের সদস্য অ্যাডভোকেট এসএম জুলফিকার আলী জুনু মনে করেন—
> “এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিষয় নয়, বরং সামাজিক সংকটও দায়ী। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব তাদের অপরাধের পথে ঠেলে দিয়েছে। টানা অভিযান ও শক্তিশালী চার্জশিটের পাশাপাশি পুনর্বাসন ছাড়া এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।”
মোহাম্মদপুর জেনভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গডফাদারদের দাপটে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি—কঠোর পদক্ষেপ নিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই অভয়ারণ্য বন্ধ করা সম্ভব।


